সার্ভিস বহি সংক্রান্ত আইনি নির্দেশিকা ও বাধ্যবাধকতা

সার্ভিস বহি কেবল একটি কাগজ নয়, এটি শ্রমিকের চাকুরীর ইতিহাস এবং আইনি নিরাপত্তার প্রধান দলিল।  অনেক ক্ষেত্রে মালিক পক্ষ শ্রমিক নিয়োগের সময় এটি চান না বা শ্রমিকও এটি দেন না।  যার কারণে শ্রমিকের পূর্বতন বেতন ও পদবীসহ অনেক কিছু নতুন মালিকের কাছে অজানা থেকে যায়।  এর সুযোগ মূলত গ্রহন করে শ্রমিকগন।  বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ এর আলোকে শ্রমিকদের 'সার্ভিস বহি' বা সার্ভিস বুক (Service Book) সংক্রান্ত বিধিবিধান নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ

১. সার্ভিস বহি কী এবং এটি কার দায়িত্ব? (ধারা ৬ ও বিধি ২১)

আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক মালিককে তার প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য নিজস্ব খরচে একটি সার্ভিস বহি সংরক্ষণ করতে হবে

  • সংরক্ষণঃ সার্ভিস বহি সাধারণত মালিকের হেফাজতে থাকবে
  • নিয়োগের সময়ঃ নতুন শ্রমিক নিয়োগের সময় যদি তার পূর্বের কোনো সার্ভিস বহি থাকে, তবে মালিক সেটি চেয়ে নেবেন এবং প্রাপ্তি স্বীকার রশিদ প্রদান করবেন
  • ব্যতিক্রমঃ মনে রাখবেন, শিক্ষাধীন (Apprentice), বদলী বা সাময়িক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সার্ভিস বহি থাকা বাধ্যতামূলক নয়

২. সার্ভিস বহির গঠন ও তথ্যসমূহ (ধারা ৭ ও বিধি ২০)

একটি আদর্শ সার্ভিস বহিতে কী কী থাকতে হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছেঃ

  • ব্যক্তিগত তথ্যঃ শ্রমিকের নাম, পিতা-মাতা/স্বামীর নাম, ঠিকানা ও জন্ম তারিখ
  • শনাক্তকরণঃ শ্রমিকের ছবি এবং বিশেষ কোনো শারীরিক চিহ্ন (শনাক্তকরণের জন্য)
  • চাকরির বিবরণঃ পদবী, চাকুরীর মেয়াদ, মজুরি ও অন্যান্য ভাতা
  • ছুটি ও আচরণঃ ভোগকৃত ছুটির হিসাব এবং শ্রমিকের আচরণের রেকর্ড
  • কাঠামোঃ বিধি-২০ অনুযায়ী, সার্ভিস বহিটি ১৬ পৃষ্ঠার হতে হবে এবং এতে ৫টি প্রধান বিভাগ থাকবে (পরিচয়, মালিকের তথ্য, মজুরি রেকর্ড, ছুটি এবং আচরণ)

৩. তথ্য হালনাগাদ ও স্বাক্ষর (ধারা ৮ ও বিধি ২১)

সার্ভিস বহি কেবল তৈরি করলেই হবে না, এটি নিয়মিত আপডেট করতে হবে:

  • সময়সীমাঃ স্থায়ী করার তারিখ হতে ১ মাসের মধ্যে সার্ভিস বহি খুলতে হবে। পরবর্তী কোনো পরিবর্তন (যেমনঃ পদোন্নতি বা মজুরি বৃদ্ধি) ঘটলে তা ১৫ দিনের মধ্যে লিপিবদ্ধ করতে হবে
  • স্বাক্ষরঃ প্রত্যেকটি ভুক্তি বা এন্ট্রিতে মালিক এবং শ্রমিক—উভয়ের স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে

৪. ডুপ্লিকেট বা অবিকল নকল সংগ্রহ (বিধি ২২)

শ্রমিক চাইলে তার সার্ভিস বহির একটি কপি নিজের কাছে রাখতে পারেনঃ

  • ফিঃ মাত্র ২০ টাকা জমা দিয়ে শ্রমিক একটি 'অবিকল নকল' (Duplicate) সংগ্রহ করতে পারেন
  • হারিয়ে গেলেঃ যদি শ্রমিকের কাছে থাকা কপিটি হারিয়ে যায়, তবে ৩০ টাকা ফি প্রদান সাপেক্ষে তিনি পুনরায় কপি সংগ্রহ করতে পারবেন
  • ডিজিটাল রেকর্ডঃ আধুনিক নিয়ম অনুযায়ী, সার্ভিস বহি ডিজিটাল পদ্ধতিতেও সংরক্ষণ করা যাবে, তবে শ্রমিককে তার কপি প্রদান করতে হবে

৫. চাকুরি অবসান ও ফেরত প্রদান (ধারা ৬ ও বিধি ২২)

চাকুরি ছেড়ে দেওয়ার সময় সার্ভিস বহি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম আছেঃ

  • ফেরত প্রদানঃ চাকুরি শেষ হওয়ার ২ কার্যদিবসের মধ্যে মালিককে সার্ভিস বহি শ্রমিককে ফেরত দিতে হবে
  • চূড়ান্ত পাওনাঃ চূড়ান্ত পাওনা (Final Settlement) পরিশোধের সময় সার্ভিস বহিতে সেই তথ্য লিখে নিয়ে আসতে হবে
  • মালিকের অধিকারঃ মালিক চাইলে শ্রমিকের ব্যক্তিগত নথির জন্য একটি ফটোকপি নিজের কাছে রেখে দিতে পারেন

Post a Comment

Previous Post Next Post